খ্যাতনামা ওলী হযরত শাহপরাণ ( রহ: )

হযরত শাহপরাণ ( রহ: ) এর মাজার  অগণিত রহমত বর্ষিত হোক আউলিয়ায়ে কেরামের কবরে যাদের অক্লান্ত পরিশ্রম ও আত্মত্যাগের মহিমায় পাক-ভারত বাংলাদ...

অগণিত রহমত বর্ষিত হোক আউলিয়ায়ে কেরামের কবরে যাদের অক্লান্ত পরিশ্রম ও আত্মত্যাগের মহিমায় পাক-ভারত বাংলাদেশ তথা সিলেটের আনাচে-কানাচে ইসলাম ধর্মের প্রচার প্রসার লাভ করেছে।
হযরত শাহপরাণ ( রহ: ) এর মাজার 


অগণিত রহমত বর্ষিত হোক আউলিয়ায়ে কেরামের কবরে যাদের অক্লান্ত পরিশ্রম ও আত্মত্যাগের মহিমায় পাক-ভারত বাংলাদেশ তথা সিলেটের আনাচে-কানাচে ইসলাম ধর্মের প্রচার প্রসার লাভ করেছে। তাদের মধ্যে হযরত শাহপরাণ (রহ: ) ছিলেন অন্যতম।

সুলতানুল বাংলা বিশ্ব বরেণ্য ওলী হযরত শাহ জালাল (রহ: )’র পরেই তার খ্যাতি। যে সকল ওলী-আউয়ালিয়াগণ ইলমে মারেফাতের কুতুব মিনারে আরোহন করার খোশ নসীব হাসিল করেছেন তাদের মধ্যে হযরত শাহ পরাণ (রহ: ) ছিলেন অন্যতম।

মহান দরবেশ হযরত শাহপরাণ (রহ: )’র জীবন বৃত্তান্ত সম্বন্ধে বিস্তারিত জানা না গেলে ও যতটুকু জানা যায়, হযরত শাহপরাণ (রহ: ) ছিলেন হযরত শাহজালাল ( রহ: ) ’র ভাগ্না।

তাঁর পূর্ব পুরুষগণ বোখারার অধিবাসী। হযরত শাহপরাণ ( রহ: ) ’র ঊর্ধ্বতন চতুর্থ পুরুষ জালাল উদ্দিন ( রহ : ) বোখারা হতে এসে প্রথমে সমরকন্দে এবং পরবর্তীতে তুর্কীস্থানে বসবাস করেন। হযরত শাহপরাণ (রহ: ) ’র পিতা একজন শীর্ষ স্থানীয় আলেম ও খুব উচ্চ স্তরেরর বুজর্গ ছিলেন। সে সময় তদাঞ্চলে তার মত কামেল বুজর্গ ব্যক্তি খুব কমই ছিলেন। তার মাতা ও ছিলেন একজন ধর্ম পরায়না নেককার মহিলা। তাহার গুণের অভাব ছিল না। অতি উন্নতি চরিত্রের অধিকারনী ছিলেন তিনি।

হযরত শাহ পরাণের জীবনে সিদ্ধি লাভের ক্ষেত্রে তাঁর নিজের অবিরাম সাধনা, সত্য ও ন্যায়ের সংগ্রামে সর্বোচ্চ ত্যাগ তিতীক্ষা যেমন বিশেষভাবে উল্লেখের দাবী রাখে, ঠিক তেমনি ভাবে তাঁহার মহীয়সী মাতার পবিত্র চরিত্র এবং নেক জীবনে ও তেমনি ভাবে পুত্রের জীবনে সাফল্য ও প্রতিষ্ঠার পেছনে সুদূর প্রসারী ভূমিকা পালন করেছে।

হযরত শাহপরাণ ( রহ: ) শৈশব ও কৈশোর অবস্থায় নিজ মাতার নিকট প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেছিলেন। অত:পর উচ্চতর শিক্ষা লাভ করার উদ্দেশ্যে অন্যান্য শিক্ষকের শরণাপন্ন হন। ইস্পাহানের সুবিখ্যাত আলেম ও খ্যাতনামা বুজর্গ হযরত কামালুদ্দিন ( রহ: ) অন্যতম প্রধান ওস্তাদ ছিলেন। তিনি তাঁর নিকট থেকে এলমে তাফসীর, হাদীস, ফিক্হা, মানতেক প্রভৃতি শিক্ষা লাভ করেন। শুনা যায়, তাঁহার জন্মগ্রহণ কালে তাঁর মাতার পার্শ্বে অবস্থানরত পরিচর্যাকারিনী মহিলাগণ সদস্য প্রসূত সন্তানের মুখে আল্লাহ আল্লাহ যিকিরের শব্দ শ্রবণ করেন। সিলেট বিজয়ে অন্যান্য আউলিয়াদের মত হযরত শাহপরাণ ( রহ: ) এর ও বিশেষ অবদান রয়েছে।

সিলেট বিজয়ের পর তরফ, ইটা, লংগা, জৈন্তা, বুন্দিশাল সহ বিভিন্ন স্থানে তিনি ধর্ম প্রচার করেন। তাই দেখা যায়, সিলেটের গুরুত্বপূর্ণ প্রায় সব এলাকাতেই তিনি দাওয়াতের কাজ করেছেন। কামালিয়াত হাসিলের পর তিনি ‘মুরাকাবা’ ‘মুশাহাদার’ মাধ্যমে তদীয় মামা ও মুর্শিদ হযরত শাহজালাল ( রহ: ) ’র সঙ্গে আধ্যাত্মিক যোগাযোগ রাখতেন। হযরত শাহপরাণ ( রহ: ) ’র মুর্শিদ ও মামা হযরত শাহজালাল (রহ: ) ’র বদৌলতেই তিনি কামালিয়াত হাসিল করেন এবং তাঁর আদেশেই তিনি সিলেট শহর থেকে প্রায় ৫/৬ মাইল পূর্বে অবস্থিত দক্ষিণ গাছ পরগণায় (খাদিমনগর) যেয়ে আস্তানা স্থাপন করেন এবং ইসলাম প্রচারে নিয়োজিত থাকেন। তদাবধি সে স্থানটি শাহপরাণ নামে প্রসিদ্ধি লাভ করে। আউলিয়া গণসাধারণ মানুষের মধ্যে অতি সাধারণ জীবন যাপন করেও ঈমানের পূর্ণতা এবং আমলের নিষ্ঠার বদৌলতেই খোদায়ী নূর লাভ করে ধন্য হয়েছেন। তাঁরা কঠোর সাধণার ফলে এমন সব অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী হন, যা সাধারণ মানুষের পক্ষে কোনো ক্রমেই সম্ভবপর নয় এমনকি স্বচক্ষে না দেখিলে সে সকল আশ্চর্য ঘটনার কথা অনেক সময়ে অনেকের পক্ষে বিশ্বাস করাও কঠিন হয়ে পড়ে। কিন্তু আউলিয়াদের কারামত যে ধ্রব সত্য তদ্বিযয়ে কোনো সন্দেহ নেই। ‘আকায়িদে নছফিয়া’ কিতাবে উল্লেখ আছে, তাঁদের কোনো বাসনা বা প্রার্থনা আল্লাহ তা’য়ালা অপূর্ণ রাখেন না। সে জন্য তাঁদের মুখে এমন বরকত প্রদান করেন যে, তাঁরা মুখ দিয়ে যা বলেন বা অন্তরে বাসনা করেন, আল্লাহ তা’য়ালা তাই বাস্তবে পরিণত করে দেন।

 হযরত শাহপরাণ (রহ: ) এর বহুকারামত বিদ্যমান আছে। তাহা হতে দু’টি কারামত উল্লেখ করছি: এক. হযরত শাহপরাণ (রহ: ) এর মাত্র পাঁচ কি ছয় বৎসর বয়সের সময়ের একটি ঘটনা মশহুর আছে। একদা তিনি স্বীয় পিতার নিকট বসে পাক কালামে মজিদ তিলাওয়াত করিতেছিলেন। এমন সময় একটি লোক এসে বলল, হুজুর আমার একটি দুর্ঘটনার খবর শুনুন। আমার একটি মাত্র ছেলে। কিন্তু তাকে কে বা কারা ধরে নিয়ে গেছে। তারপর আজ তিন মাস অতীত হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত তাহার খোঁজ খবর নেই। কোথাও তার সন্ধান পাচ্ছি না। দেখতেই পাচ্ছেন আমি বৃদ্ধ মানুষ। সুতরাং আমি আমার চোখের পুত্তুলি পুত্রটিকে হারিয়ে চারিদিক একেবারে অন্ধকার দেখছি। আমার স্ত্রী কলিজার টুকরা পুত্রটিকে হারাইয়া দিবা নিশি কাঁদতে কাঁদতে প্রায় অন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। অনুগ্রহ পূর্বক আপনি আমার ছেলেটির জন্য দোয়া করুন, সে যেন আমাদের কোলে ফিরে আসে। হযরত শাহপরাণ (রহ: ) এর পিতা কিছু বলবার পূর্বেই হযরত শাহপরাণ (রহ: ) বলে উঠলেন যাও তোমার কোনো চিন্তা নেই, নিশ্চিন্ত মনে তুমি গৃহে প্রত্যাবর্তন কর এবং তথায় গিয়ে তুমি তাকে খানাপিনা খাওয়ানোর ব্যবস্থা কর। মাগরিবের নামাযের পূর্বেই তোমার ছেলে ইনশাআল্লাহ বাড়ি ফিরে আসবে।

আল্লাহ তা’ওয়ালার কাছে সবই সম্ভব। তাঁর কুদরত কে বুঝিতে পারে? বালক হযরত শাহপরাণ (রহঃ ) এর এই কথা বলার ভঙ্গির মধ্যে এমন কিছু ছিল, যা তার বুজুর্গ পিতাকেও বিস্মিত করে তুলল। তিনি পুত্রকে জিজ্ঞাসা করলেন, বাবা শাহ পরান। তুমি এই ব্যাপারে এত নিশ্চিত হলে কী করে? হযরত শাহপরাণ (রহ: ) তাঁহার পিতাকে পবিত্র কুরআন শরীফে বর্ণিত হযরত খিযির ( আ: ) ও হযরত মুসা ( আ: ) এর ঘটনা উল্লেখ করিয়া বললেন, পরম করুণাময় আল্লাহ তা’য়ালা যাকে ইচ্ছা করেন, তাকেই তাঁহার অগাধ জ্ঞান ভান্ডার হতে জ্ঞান দান করিয়া থাকেন। উল্লেখিত লোকটিকে হযরত শাহপরাণ যা বলেছিলেন, তা সম্পূর্ণ সত্যে পরিণত হয়েছিল। উক্ত বৃদ্ধের সেই হারানো ছেলেটি মাগরিবের ওয়াক্তের পূর্বেই বাড়ি ফিরিয়া এসেছিল। দুই. হযরত শাহজালাল ( রহ: ) সিলেট আসার পথে হযরত নিজাম উদ্দিন আউলিয়া ( রহ: ) ’র সম্মানিত মেহমান হিসেবে কয়েকদিন দিল্লীতে অবস্থান করেন। দিল্লী থেকে আসার সময় হযরত নিজাম উদ্দিন আউলিয়া তাঁকে একজোড়া সুরমা রঙের কবুতর উপহার দেন। সিলেটে আসার পর কবুতর দুটোর বংশ বৃদ্ধি পায়। শতাব্দীর পর শতাব্দী অতিক্রান্ত হবার পর আজও অনেক মানুষ হযরত শাহজালাল (রহ: ) ’র প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এই জালালী কবুতরগুলো খায়না কিংবা বধ করে না।

সাধারণ মানুষ এমন কি হযরত শাহজালালের সহচর কেউই যখন জালালী কবুতর বধ করতে সাহস পাচ্ছিলেন না, তখন হযরত শাহপরাণ ( রহ: ) প্রতিদিন একটি করে কবুতর জবাই করে খাওয়া শুরু করেন এবং কবুতরের পালকগুলো তিনি সযত্নে রেখে দিতেন। এমনিভাবে প্রতিদিন কবুতর খাওয়ার ফলে কবুতরের সংখ্যা কিছু হ্রাস পেলো। একদিন কবুতরের উপর খেয়াল হলো হযরত শাহজালাল (রহ: ) ’র। খাদেম গণকে তিনি এর কারণ জিজ্ঞাসা করলে তাঁরা আসল ঘটনা খুলে বললো। হুকুম হলো শাহপরাণ (রহ: ) কে ডেকে আনার। হযরত শাহপরাণ ( রহ: ) তখন মোরাকাবায় ছিলেন। তাঁকে তলবের কারণ জানতে পেরে বললেন, ‘একটু অপেক্ষা করুন, আমি কবুতরগুলো ফেরৎ দিচ্ছি।’ এই বলে তিনি হুজরার পার্শ্বে রক্ষিত পালকগুলো হাতে নিয়ে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বাতাসে উড়িয়ে দিয়ে বললেন- যাও আল্লাহর হুকুমে তোমরা হযরত শাহজালালের দরবারে উড়ে যাও। সাথে সাথে কবুতরগুলো জিন্দা হয়ে উড়ে গেল। ভাগ্নার এহেন কারামতি দেখে মামা ও মুর্শিদ হযরত শাহজালাল (রহ: ) অত্যন্ত খুশী হলেন। তাঁকে দূরে কোথাও আস্তানা স্থাপন করতে নির্দেশ দিলেন। মামার আদেশ অনুসারে তিনি খাদিম পাড়া চলে যান এবং সেখানে তাঁর সাধনা ক্ষেত্র ও ধর্ম প্রচারে মনোনিবেশ করেন।

আজও পৃথিবীর বিভিন্ন স্থান হতে অসংখ্য লোক প্রতিদিন হযরত শাহজালাল ( রহ: )’র পবিত্র মাজার জিয়ারত করার পর হযরত শাহপরাণ (রহ: )’র মাজার জিয়ারত করতে যায়। এমন কি রাষ্ট্র প্রধান, সরকার প্রধান, মন্ত্রী, এম পিগণও তাদের নির্বাচনী কাজ সেখান থেকে শুরু করেন। রাত-দিন কুরআন তেলাওয়াত, জিয়ারত, মিলাদ মাহফিল, দোয়া-দুরুদ, যিকির-আযকার ফাতেহা পাঠ করেন। পৃথিবীর বিখ্যাত সম্রাট গণের সমাধি সৌধেও তা হয় না। এখানে এসে আশেকান গণ লাভ করেন হৃদয়ে অনাবিল প্রশান্তি।

পীর ফকির, সাধক-দরবেশগণ লাভ করেন আধ্যাত্মিক বা রুহানী আলোর সন্ধান। আলেম-উলামারা লাভ করেন বাতেনী ইলমের আবে হায়াত রুহানী ফয়েজ। কিন্তু অনেক মাজারে ওরসকে কেন্দ্র করে মাদক দ্রব্য, মদ, গাজা, জুয়া- খেল-তামাশ, হৈ-হুল্লুড়, বাদ্যযন্ত্র দ্বারা গান, নারী-পুরুষের অবাধ বিচরণ, কবরে সিজদা সহ নানা ধরণের অসামাজিক কার্যকলাপ ও শিরকী আচরণ হতে দেখা যায়। এ সমস্ত অসামাজিক কার্যকলাপ বন্ধ করা সকলের ঈমানী দায়িত্ব। নতুবা আল্লাহ তা’য়ালার পক্ষ থেকে গজব আসলে শুধু তাদের জন্য আসবে না সবাই এর ফল ভোগ করতে হবে। তাই ওরসের নামে আউলিয়াদের মাজারে শিরকী, বিদয়াতী কার্যকলাপ নয় বরং শরীয়াহ ভিত্তিক কার্যকলাপই কাম্য। আল্লাহ রাববুল আলামীন এই মহান ওলীর রুহের চির শান্তি প্রদান করুন। তাঁকে জান্নাতুল ফেরদাউস নসীব করুন। এবং তাঁহার উসিলায় আমাদের দেশকে বিভিন্ন ধরণের মহামারীর কবল থেকে হেফাযত করুন। আমীন।

সহায়ক গ্রন্থ : ১. হযরত শাহজালাল (রহ: ) ও তাঁর কারামত : সৈয়দ মোস্তফা কামাল। ২. হযরত শাহপরাণ (রহ: ) : মাওলানা মাজার উদ্দিন। ৩. সিলেটে ইসলাম: দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ। ৪. কারামাতুল আউলিয়াই হাক্কুন : মোহাম্মদ আব্দুল হক ও ৫, সিলেটের ডাক।

Related

মনীষী 4323177409716224002

বিজ্ঞাপন

ফেইসবুক এ সাথে থাকুন

সিলেট

সিলেট উত্তর পূর্ব বাংলাদেশের একটি প্রধান শহর, একই সাথে এই শহরটি সিলেট বিভাগের বিভাগীয় শহর। এটি সিলেট জেলার অন্তর্গত।

সুরমা নদীর তীরবর্তী এই শহরটি বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ ও গুরুত্বপুর্ণ শহর।

প্রাকৃতিক সৌন্দর্য মন্ডিত এ শহরটি দেশের আধ্যাত্মিক রাজধানী হিসেবে খ্যাত।

শিল্প, প্রাকৃতিক সম্পদ ও অর্থনৈতিক ভাবে সিলেট দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম ধনি জেলা। wikipedia

সর্বমোট পাঠক

sponsor

item