হযরত শাহ জালালের (রঃ) স্মৃতিধন্য জালালী কবুতরের ইতিবৃত্ত

 জালালী কবুতর জালালী কবুতর গত ৭০০ বছর ধরে বাংলা-ভারতীয় অঞ্চলের মানুষ এবং এ অঞ্চলে আসা পর্যটকদের নিকট এক ঐতিহ্যবাহী এবং পবিত্র কবুতর...

 জালালী কবুতরের ইতিবৃত্ত
 জালালী কবুতর


জালালী কবুতর গত ৭০০ বছর ধরে বাংলা-ভারতীয় অঞ্চলের মানুষ এবং এ অঞ্চলে আসা পর্যটকদের নিকট এক ঐতিহ্যবাহী এবং পবিত্র কবুতরের নাম। বাংলাদেশের প্রায় ২০ প্রজাতির কবুতরের মধ্যে খ্যাতি এবং পরিচিতির দিক থেকে এর অবস্থান শীর্ষে। সম্ভবতঃ এটিই পৃথিবীর একমাত্র কবুতর যার সাথে একটি সুন্দর ইতিহাস জড়িয়ে আছে।

আসুন জেনে নিই অলৌকিকতার মহিমায় ভাস্বর সেই ইতিহাস।

‘জালালী কবুতর’ নামটি কেমন করে এল?

ইয়েমেনের বিখ্যাত সূফী দরবেশ ওলীকুল শিরোমণি কুতুবুল আকতাব হযরত শাহ জালাল মুজাররদ ইয়েমেনী (রঃ) (১১৯৭-১৩৪৭ খ্রিঃ) যখন ইসলাম প্রচার করতে সুদূর ইয়েমেন থেকে ১৩০১ খ্রিস্টাব্দে তৎকালীন ভারতের দিল্লীতে পৌঁছান, তখন দিল্লীর বিখ্যাত ওলী-আল্লাহ হযরত নিযামুদ্দীন আউলিয়া (রঃ) (১২৩৮-১৩২৫ খ্রিঃ) তাঁর আধ্যাত্মিক শক্তির পরিচয় পেয়ে তাঁকে সাদরে অভ্যর্থনা জানান এবং বিদায়ের সময় হযরত শাহ জালাল (রঃ)-এর হাতে উপহার হিসেবে নীল এবং কালো রংয়ের এক জোড়া কবুতর তুলে দেন। এর ঠিক দুই বছর পর অর্থাৎ ১৩০৩ খ্রিস্টাব্দে শাহ জালাল (রঃ) যখন ৩৬০ জন সফরসঙ্গী নিয়ে শ্রীহট্ট জয় করতে বাংলায় আসেন, তখন কবুতর দুটোকে সঙ্গে করে নিয়ে আসেন। আর বিভিন্ন অলৌকিক ঘটনার মধ্য দিয়ে শ্রীহট্ট জয় করে জয়ের প্রতীকস্বরূপ কবুতর দুটোকে উড়িয়ে দেন।(বিঃদ্রঃ সিলেট জয়ের অলৌকিক কাহিনী অন্য একটি পোস্টে আরেকদিন আলোচনা করব।)

সেই থেকে কবুতরগুলো (এবং এদের পরবর্তী বংশধররা) পরিচিতি পায় ‘জালালী কবুতর’ নামে। তবে সিলেটে আঞ্চলিকভাবে এরা ‘জালালী কইতর’ নামেই পরিচিত। সিলেটে কবুতরকে ‘কইতর’ বলা হয়।

জালালী কবুতর সম্পর্কে সাধারণ তথ্য

জালালী কবুতরের ইংরেজি নাম রক পিজিয়ন (Rock Pigeon)। বৈজ্ঞানিক নাম কোলাম্বা লিভিয়া (Columba livia)। এর অর্থ নীলভে-ধূসর পায়রা। কেননা, জালালী কবুতর সাধারণত নীলচে-ধূসর বর্ণের হয় যেমনটি ছবিতে আপনারা দেখছেন। এরা গড় আয়ু ৫-১০ বছর। জালালী কবুতরের সংখ্যা কত তা আজও জানা না গেলেও এই কবুতর শুমারির উদ্যোগ শীঘ্রই নেয়া হবে বলে জানিয়েছে সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাণী অধিকার বিষয়ক সংগঠন প্রাধিকার। বাংলাদেশের বন্য প্রাণী আইনে (১৯৮৪) এরা সংরক্ষিত প্রাণী হিসেবে চিহ্নিত।

অনেকে অবশ্য এই প্রজাতিটিকে গোলা পায়রা বলে ভুল করেন। তবে পাখি বিশেষজ্ঞদের নিকট গোলা পায়রা অন্য প্রজাতি ও বৈশিষ্ট্যের বলে পরিচিত। আর একই রকম দেখতে লাল রংয়ের পায়রাও জালালী কবুতর হিসেবে গণ্য নয়।

জালালী কবুতরের বিশেষ বৈশিষ্ট্য

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে একই প্রজাতির অনেক কবুতরের অস্তিত্ব সম্পর্কে জানা গেলেও এই কবুতরগুলোর একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এদেরকে উড়িয়ে দেয়া হলেও এরা হযরত শাহ জালাল (রঃ)-এর দরগাহ (ইন্তেকালের পূর্বে যেখান থেকে তিনি ইসলাম প্রচার করতেন) ছেড়ে চলে যায় নি। সিলেটের কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনেটিক্স এন্ড অ্যানিম্যাল ব্রিডিং বিভাগের প্রভাষক ডঃ নয়ন ভৌমিকের ছয় মাস ব্যাপী গবেষণায় দেখা গেছে, গত ৭০০ বছর যাবৎ এরা দরগাহ প্রাঙ্গনেই রয়ে গেছে। এরা স্বেচ্ছায় দরগাহ ছেড়ে যত দূরেই উড়ে যাক না কেন আবার সেখানেই ফিরে আসে। তবে সিলেট অঞ্চল ছাড়া দেশের অন্যান্য অঞ্চলে যেসকল জালালী কবুতর পাওয়া যায়, সেগুলো মূলতঃ পরবর্তীতে সিলেট থেকে লোকজন কর্তৃক স্থানান্তরিত হয়েছে। আরও জানা গেছে, এই প্রজাতির কবুতরের আদি নিবাস দিল্লী। পরবর্তীতে পাওয়া যেত কেবল দিল্লী আর সিলেটে। তবে এখন বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে।

এদের আরেকটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এরা নিজস্ব প্রজাতির সঙ্গী ছাড়া অন্য আর কোনো কবুতর প্রজাতির সাথে মিলিত হয় না। তারপরও বিশেষ সতর্কতা নেয়া হয়েছে দরগাহ প্রাঙ্গনে, বিশেষভাবে সাইনবোর্ডে লিখিত আছে যেন কেউ অন্য প্রজাতির পায়রা এখানে এনে ছেড়ে না দেয়। আছে স্থানীয় লোকজনের কড়া নজরদারি।

আউলিয়া কেরামের কারামতের নিদর্শন

এ প্রসঙ্গে একটি কাহিনী উল্লেখ করা যায়। হযরত শাহ জালাল (রঃ)-এর ভাগ্নে হযরত শাহ পরাণ (রঃ) ছিলেন উপরে উল্লেখিত সেই ৩৬০ আউলিয়ার একজন। হযরত শাহ পরাণ (রঃ) কবুতর খেতে খুবই পছন্দ করতেন। তিনি প্রতিদিন একটি করে কবুতর খেতেন যার মধ্যে জালালী কবুতরও থাকত। তবে খাওয়ার পর তিনি পালকগুলো ফেলে না দিয়ে জমিয়ে রাখতেন। একদিন জালালী কবুতরের সংখ্যা কম দেখে খাদেমেদের জিজ্ঞাসা করলে তারা হযরত শাহ জালাল (রঃ)কে আসল ঘটনা খুলে বলেন। এটা জানার পর হযরত শাহ জালাল (রঃ) কিছুটা রাগান্বিত হলে হযরত শাহ পরাণ (রঃ) মামাকে বললেন, “আমি আপনার কবুতরগুলো ফেরত দিচ্ছি।” এরপর সেই রেখে দেওয়া পালকগুলোকে আকাশে উড়িয়ে বললেন, “যাও ! আল্লাহর হুকুমে শাহজালালের দরবারে পৌঁছে যাও।” সাথে সাথে পালকগুলি জালালী কবুতর হয়ে তার মামার দরবারে এসে হাজির হল। সুবহান আল্লাহ !
(এই কাহিনী হযরত শাহ জালাল (রঃ) কিংবা হযরত শাহ পরাণ (রঃ)-এর প্রায় প্রতিটি জীবনীগ্রন্থেই রয়েছে।)

বিলুপ্তির পথে জালালী কবুতর?

একসময় জালালী কবুতর দেখা যেত সিলেটের বিভিন্ন বাড়ির ছাদে ও আঙ্গিনায়, বাজারে, চালের আরতে। এমনকি সিলেট শহরে অবস্থিত ঐতিহাসিক কিন ব্রিজেরও শোভা বর্ধন করত এই জালালী কবুতর। ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ে চলা জালালী কবুতরে ছেঁয়ে যাওয়া সিলেটের আকাশ ছিল এক নান্দনিক দৃশ্য। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এর সংখ্যা দিন-দিন কমে যাচ্ছে। এখন আর আগের মত দেখা যায় না। কারণ, অনেকে ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে না খেলেও কিছু মানুষ এগুলো ধরে নিয়ে গিয়ে খেয়ে ফেলে কিংবা বিক্রি করে, অথবা বিভিন্ন স্থানে পাচার করে দেয়।

শুধুমাত্র হযরত শাহ জালাল (রঃ) এবং শাহ পরাণ (রঃ)-এর পুণ্য স্মৃতি রক্ষার্থেই নয়, বরং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং সিলেট অঞ্চলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বজায় রাখতে জালালী কবুতর সংরক্ষণ করা এবং এ সম্পর্কে গণসচেতনতা সৃষ্টি করা এখন সময়ের দাবী।

Related

প্রচ্ছদ 7645701908166703222

সিলেট

সিলেট উত্তর পূর্ব বাংলাদেশের একটি প্রধান শহর, একই সাথে এই শহরটি সিলেট বিভাগের বিভাগীয় শহর। এটি সিলেট জেলার অন্তর্গত।

সুরমা নদীর তীরবর্তী এই শহরটি বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ ও গুরুত্বপুর্ণ শহর।

প্রাকৃতিক সৌন্দর্য মন্ডিত এ শহরটি দেশের আধ্যাত্মিক রাজধানী হিসেবে খ্যাত।

শিল্প, প্রাকৃতিক সম্পদ ও অর্থনৈতিক ভাবে সিলেট দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম ধনি জেলা। wikipedia

সর্বমোট পাঠক

item